খোলা চুল আর মেহেদির ভেতর লুকানো সময়
নিশু সবুজের ভেতর দাঁড়িয়ে ছিল পেছন ফিরে। খোলা চুল পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে, বাতাসে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বারবার। সে জানত না কেউ তাকিয়ে আছে। জানলে হয়তো একটু সরে দাঁড়াত। কিন্তু দিহান তখন থেমে গিয়েছিল। এমন থামা সে আগে কখনো অনুভব করেনি। যেন সময় হঠাৎ বুঝিয়ে দিল—এই দৃশ্যটা মনে গেঁথে রাখো।
ভালোবাসা সবসময় চোখে ধরা পড়ে না। কখনো কখনো সেটা বুকের ভেতর ভার হয়ে নামে। দিহানের ঠিক সেটাই হয়েছিল।
নিশুর হাত দুটো একটু উঁচু করে তোলা ছিল। আঙুলে মেহেদির নকশা তখনো গাঢ়। সে হাতের দিকে তাকিয়ে দিহানের মনে হয়েছিল, এই হাত একদিন কাঁপবে, ভেঙে পড়বে, আবার শক্ত হবে। তখনো তারা কেউ জানত না, এই হাত আর এই চোখ কত ঝড় পেরোবে।
তাদের গল্পটা হঠাৎ করে শুরু হয়নি। ছোট ছোট কথা, নিরব উপস্থিতি, ক্লান্ত দিনের শেষে একে অপরকে খুঁজে নেওয়া—এইসব মিলেই নিশু দিহানের জীবনে ঢুকে পড়েছিল। কোনো প্রস্তাব ছিল না, কোনো নাটক ছিল না। তবু একদিন দিহান বুঝে গিয়েছিল, নিশু ছাড়া তার দিন অসম্পূর্ণ।
যেদিন দিহান প্রথম বলেছিল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি,” নিশু তখন অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। চোখ নামানো, হাতের আঙুল নেড়ে নেওয়া। তারপর খুব আস্তে বলেছিল, “সহজ হবে না।” দিহান মাথা নেড়েছিল। সে জানত। তবু পিছিয়ে আসেনি।
বিয়ের কথা উঠতেই বাস্তবতা আছড়ে পড়েছিল। টাকার হিসাব, পরিবারের চাপ, ভবিষ্যতের ভয়। নিশু অনেক রাত কেঁদেছে চুপচাপ। দিহান অনেক রাত ঘুমাতে পারেনি। তবু তারা আলাদা হয়নি। কারণ তাদের ভালোবাসা স্বপ্নের মতো হালকা ছিল না, ছিল মাটির মতো শক্ত।
বিয়ের দিন নিশুর খোলা চুল বাঁধা হয়েছিল যত্ন করে। মেহেদি রাঙা হাত কাঁপছিল। চোখে জল ছিল, ঠোঁটে হাসি। দিহান তার দিকে তাকিয়ে বুঝেছিল, এই মেয়েটা আজ নিজের পুরো জীবন তুলে দিচ্ছে তার হাতে। সেই বোঝা সে কখনো হালকা করে নেয়নি।
সংসার খুব দ্রুত বাস্তব হয়ে উঠেছিল। ভাড়া ঘর, সীমিত আয়, ক্লান্ত শরীর। অনেক দিন ভালো কথা হয়নি। অনেক রাত ঝগড়া হয়েছে। নিশু কখনো কখনো ভাবত, এই জীবন কি সে কল্পনা করেছিল? আবার দিহানের কাঁধে মাথা রাখলেই সব প্রশ্ন থেমে যেত।
একদিন নিশু জানতে পারল সে মা হতে চলেছে। খবরটা শুনে সে প্রথমে ভয় পেয়েছিল। তারপর কেঁদে ফেলেছিল। দিহান চুপচাপ তার হাত ধরেছিল। সেই ধরায় ছিল ভরসা, ভয় আর দায়িত্ব একসাথে।
সন্তান জন্মের দিন নিশুর শরীর ভেঙে পড়েছিল। যন্ত্রণায় চিৎকার, চোখের জল। কিন্তু ছোট্ট দিহানের হাত যখন তার আঙুল আঁকড়ে ধরেছিল, সব কষ্ট হঠাৎ অর্থ পেয়ে গিয়েছিল। তারা ছেলের নাম রেখেছিল জিহান জুনিয়র, কিন্তু ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল শুধু “জিহান”।
মা হওয়া নিশুকে বদলে দিয়েছিল। রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে থাকা, সন্তানের জ্বর, কান্না। শরীর ক্লান্ত, মন ভেঙে পড়া। অনেক সময় সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খোলা চুলে সাদা রেখা দেখে চমকে উঠত।
দিহানও বদলে গিয়েছিল। আগের মতো হাসিখুশি ছিল না। দায়িত্ব তাকে চুপচাপ করে দিয়েছিল। অনেক কথা সে নিজের ভেতরেই রেখে দিত। নিশু কখনো কখনো ভাবত, তারা কি একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?
কিন্তু জীবন আবার শেখায়। সন্তান বড় হতে লাগল। হাঁটা, কথা বলা, স্কুলে যাওয়া। দিহান আর নিশুর জীবন আবার রঙ পেল। সন্তানের হাসিতে তারা নিজেদের কষ্ট ভুলে যেত।
সংগ্রাম শেষ হয়নি। স্কুলের খরচ, ভবিষ্যতের চিন্তা, নিজেদের স্বপ্ন বিসর্জন। নিশু অনেক কিছু চেয়েও আর চায়নি। দিহান অনেক কিছু বলতে চেয়েও বলেনি। তারা শিখেছিল, ভালোবাসা মানে সব পাওয়া নয়, অনেক কিছু ছেড়ে দেওয়া।
সময় তাদের বদলে দিয়েছে। নিশুর খোলা চুলে এখন ক্লান্তি আছে, সৌন্দর্য কমেনি। মেহেদি আর আগের মতো হয় না, কিন্তু হাত ধরার ভঙ্গি বদলায়নি। দিহানের চোখে এখন আগের আগুন নেই, আছে গভীর নিশ্চয়তা।
একদিন সন্তান নিজের পথে হাঁটতে চাইল। নিশুর বুক ফাঁকা হয়ে এসেছিল। দিহান চুপ করে তার হাত ধরেছিল। তারা জানত, এটাই জীবনের নিয়ম।
আজ নিশু আবার সবুজের ভেতর দাঁড়ায় কখনো কখনো। খোলা চুল, শান্ত চোখ। দিহান দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। এখন আর কিছু বলার দরকার হয় না।
কারণ তারা জানে—
ভালোবাসা শুধু শুরু নয়,
ভালোবাসা টিকে থাকার গল্প।
📝মোহাম্মদ মামুনুল ইসলাম চৌধুরী
🕹️রিয়াদ, সৌদি আরব

Comments
Post a Comment