নীল শাড়ির উপাখ্যান,নীল শাড়ির সেই মেয়েটি


দুপুরের আলোটা তখন গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নরমভাবে নেমে আসছে। সেই আলোয় দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে—পেছন ফিরে। লম্বা কালো চুল পিঠ বেয়ে নদীর মতো নেমে গেছে, আর গায়ে জড়ানো নীল শাড়িটা বাতাসে দুলে এক অদ্ভুত মাধুর্য তৈরি করছে। মনে হয় আকাশের নীল আর তার শাড়ির নীল এক হয়ে গেছে।
এই দৃশ্যটাই সেই উপাখ্যানের শুরু, যেখানে প্রেম শব্দে নয়, দৃশ্যে জন্ম নেয়।
সে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। অভিমান আছে, কিন্তু সেই অভিমান রাগ নয়—মিষ্টি, নরম, ভালোবাসায় ভেজা। এমন অভিমান যে ছুঁতে গেলে ভেঙে যাবে, না ছুঁলে আরো গভীর হয়ে উঠবে।
তার শাড়ির প্রতিটা ভাঁজে যেন আলাদা গল্প লুকানো। প্রথম দেখা, প্রথম হাসি, প্রথম লজ্জা—সব যেন এই নীলের গভীরে মিশে গেছে। তার চুলের দৈর্ঘ্যে জমে আছে হাজারো না বলা কথা, যে কথাগুলো সে মুখে বলে না, কিন্তু তার উপস্থিতিই বলার জন্য যথেষ্ট।
যে মানুষ তাকে ভালোবাসে, সে জানে—এভাবেই তাকে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। নীরব, পেছন ফিরে, একটু অভিমানী, আর সম্পূর্ণ ভালোবাসায় ডুবে থাকা।
ছেলেটা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। সে জানে, আজ মেয়েটার এই অভিমান ভাঙাতে তাকে কোনো বড় কথা বলতে হবে না। শুধু একটু কাছে গিয়ে দাঁড়ালেই হবে। কারণ তার উপস্থিতিই মেয়েটার নরম আবেগকে সান্ত্বনা দিতে পারে।
ছেলেটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। দুজনের মাঝে নীরবতাই বড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু সেই নীরবতাতেই হাজারো প্রেমের ছোঁয়া লুকানো। কাছাকাছি এসে সে থামে। মেয়েটার চুল বাতাসে ওঠানামা করছে, গায়ের নীল শাড়ি আলো ছুঁয়ে অন্যরকম জেল্লা দিচ্ছে।
মেয়েটা শব্দ করে না, ঘুরেও তাকায় না। কিন্তু তার নিঃশ্বাসের ভেতর একটা নরম প্রত্যাশা জমে আছে—ছেলেটা একবার পাশে দাঁড়াক, একবার ডাকুক, একবার স্পর্শ করুক।
ছেলেটা খুব আস্তে বলে—
“তুমি যেদিন অভিমান করে এভাবে দাঁড়াও, সেদিন তোমাকে আরো নতুন লাগে।”
মেয়েটার হৃদস্পন্দন যেন মুহূর্তে বদলে যায়। নীরবতার ভেতর প্রেমের স্রোত বইতে শুরু করে।
ছেলেটা আরেকটু কাছে এসে বলে—
“এই নীল শাড়িটার মধ্যে তোমার যে সৌন্দর্য আছে, সেটা শুধু চোখে নয়, মনে লাগে। মনে হয় পৃথিবীর সব ভালোবাসা এক হয়ে তোমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।”
এই কথাগুলো তার অভিমানকে ভেঙে দেয়। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখে থাকে অল্প জল, অল্প লজ্জা আর প্রচুর ভালোবাসা।
ছেলেটা তার হাত ধরার চেষ্টা করে, আর মেয়েটা হাত সরায় না—অভিমানের শেষ সেখানেই।
বাতাস থেমে যায়। শাড়ির নীল থেমে যায়।
শুধু তাদের দুজনের মাঝে জন্ম নেয় এক নামছাড়া উপাখ্যান—
যেখানে হাজারো ভালোবাসার ছোঁয়া মিলে একটাই গল্প তৈরি করে।
এই গল্পের কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই।
শুধু দুজন মানুষ, নীরবতা, নীল শাড়ি, লম্বা চুল, আর এক গভীর প্রেমের স্পর্শ—
যা প্রতিবারই নতুন হয়ে জন্ম হয়, ঠিক এই ছবির মতো দৃশ্যের মধ্যে।
আকাশের রং ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। দুপুরের কোমল আলো নামতে নামতে বিকেলের উষ্ণ শান্তিতে ঢলে পড়ে। চারপাশের সবুজ ঘেরা পরিবেশটা যেন হঠাৎ আরও নরম হয়ে যায়, যেন এই দুই মানুষের গল্পটাকে নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখতে চায়।
মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ানোর পর দুজনেই থমকে থাকে কিছুক্ষণ।
শব্দ নেই।
বাতাসও যেন তাদের জন্য একটু ধীরে বইতে থাকে।
ছেলেটা তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই চোখের ভেতর জমে থাকা অভিমান আর কোমল ভালোবাসার মিশ্রণ দেখে তার বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে।
“তুমি জানো,” ছেলেটা নরম গলায় বলে,
“আমি তোমার সাথে অভিমান চাই… কারণ অভিমানের পর তোমাকে বেশি করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।”
মেয়েটা চোখ নামিয়ে ফেলে। তার গাল হালকা লাল হয়ে ওঠে।
সে কিছু বলে না, কিন্তু তার নীরবতাই হাজারটা কথা বলে।
ছেলেটা বাতাসে দুলতে থাকা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দেয়। মেয়েটার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। সেই মুহূর্তটা যেন তাদের দুজনের জন্যই পৃথিবীর সবচেয়ে শান্ত সময়।
“চল,” ছেলেটা বলে,
“একটু হাঁটি। আমরা দুজনেই এই জায়গাটাকে মনে রাখব।”
মেয়েটা কিছু না বলে এগিয়ে যায়। শাড়ির নীল ভাঁজগুলো তার হাঁটার ছন্দে দুলতে থাকে। ছেলেটা পেছন থেকে তাকিয়ে দেখে—মেয়েটা হাঁটছে, কিন্তু যেন পুরো দৃশ্যটা নরম আলোয় তৈরি কোনো চিত্রকর্ম।
হাঁটতে হাঁটতে তারা একটা ছোট নির্জন পুকুরের পাশে আসে। পানি নিঃশব্দ, আর সূর্যের শেষ আলো তাতে পড়ে ঝিলমিল করছে। মেয়েটা থেমে পানি দেখে, আর ছেলেটা তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে—
“তোমার ওড়নার একপাশ পানিতে ছুঁয়ে গেছে।”
মেয়েটা হাসে।
একটা ছোট, নরম, খুব মিষ্টি হাসি।
এমন হাসি যা প্রেমকে মুহূর্তে হালকা আর উষ্ণ করে তোলে।
ছেলেটা সেই হাসি দেখে বলে—
“এই হাসিটা আমি পুরো জীবন দেখতে চাই।”
মেয়েটা তাকায়।
তার চোখে কোনো অভিমান নেই। শুধু একটি দৃঢ়, নরম, নিশ্চুপ নিশ্চিততা—
সে এই মানুষটাকে ভালোবাসে। গভীরভাবে। নির্ভর করে। বিশ্বাস করে।
“তুমি কি কখনো চলে যাবে?” মেয়েটা হঠাৎ বলে।
কণ্ঠ নরম, কিন্তু ভেতরে ভয়।
ছেলেটা কাছে এসে তার হাত ধরে।
“তোমাকে কি মনে হয় আমি পারব?”
তার কণ্ঠে কোনো নাটক নেই—একটি সাধারণ, সত্য উত্তর।
মেয়েটা মাথা নিচু করে।
তার চুল গাল ছুঁয়ে পড়ে।
ছেলেটা আঙুল দিয়ে ওগুলো সরিয়ে বলে—
“আমি থাকব। যতদিন তুমি চাও।”
পুকুরের ঢেউ ফিসফিস করে ওঠে।
সন্ধ্যা নেমে আসে।
নীল শাড়ির রং গাঢ় হয়, আর তাদের দুজনের ছায়া এক হয়ে যায়।
এই মুহূর্তটা হয়তো ছোট…
কিন্তু তাদের গল্পে এটা সেই অধ্যায়,
যেখানে অভিমানের পর ভালোবাসা আরও গভীর হয়,
যেখানে নীরবতা হয়ে ওঠে সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা,
আর যেখানে তারা বুঝতে পারে—
তারা হয়তো অনেকদিনের জন্য,
হয়তো পুরো জীবনের জন্য একে অপরের হয়ে গেছে।
রাত ধীরে ধীরে নেমে আসে। আকাশে প্রথম তারা জ্বলে ওঠে। গাছের পাতায় হালকা শব্দ, বাতাসে এক ধরনের কোকিলের ডাক—সব মিলিয়ে দৃশ্যটা যেন আরও রোমান্টিক হয়ে ওঠে।
মেয়েটা পুকুরপাড় থেকে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার নীল শাড়ির ভাঁজে এখন সন্ধ্যার অন্ধকার লেগে আছে। ছেলেটা পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে—
“এখন কী ভাবছো?”
মেয়েটা একটু দূরে তাকায়।
“ভাবছি… প্রেম কি সত্যিই এত নরম? নাকি আমরা নিজেরাই নরম করে ফেলি?”
ছেলেটা হালকা হাসে।
“তুমি থাকলে প্রেম নরম হয়। তোমার অভিমানও সুন্দর লাগে। তোমার নীরবতাও ভালো লাগে। সবই নরম হয়ে যায়।”
মেয়েটা চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
এই ছেলেটা তাকে এমনভাবে বোঝে, যে তার সমস্ত অভিমান, ভয়, লজ্জা—সব ধীরে ধীরে গলে যায়।
তারা হাঁটতে থাকে অন্ধকার পথে। দুজনের ছায়া পাশাপাশি, যেন দুটো গল্প একই পথে হাঁটছে।
কিছুক্ষণ পর মেয়েটা বলে—
“আমি ভয় পাই… যদি একদিন তুমি আমাকে ভুলে যাও?”
ছেলেটা থেমে তার দিকে তাকায়।
“আমি পারব না। নীল শাড়ি আমাকে সবসময় তোমার কথা মনে করিয়ে দেবে। তোমার চুলের দোলা, তোমার অভিমান, তোমার নীরবতা—সব মনে থাকবে। তুমি ভুল হওয়ার মতো কেউ নও।”
মেয়েটা আর কিছু বলে না।
সে শুধু ছেলেটার পাশে এসে দাঁড়ায়—যেন এটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
রাত আরো গভীর হয়। চাঁদ উপরে উঠে আসে। আলো নেমে এসে তার নীল শাড়ির ওপর একটা রূপোলি ছায়া ফেলে।
ছেলেটা সেই দৃশ্য দেখে থমকে যায়।
এমন সৌন্দর্য চোখ দিয়ে দেখা যায়, কিন্তু মনে নিতে সময় লাগে।
“তুমি থেমে গেলে কেন?” মেয়েটা জিজ্ঞেস করে।
ছেলেটা মৃদু হাসে।
“তোমাকে দেখছি। শুধু দেখছি। মনে হচ্ছে আজকের রাতটা পুরোপুরি তোমার জন্য তৈরি।”
মেয়েটা হেসে চোখ নিচু করে।
“এভাবে তাকিও না… ভয় লাগে।”
“ভয় কেন?”
“ভয় হয়… তুমি হয়তো একদিন এভাবে তাকানো বন্ধ করে দেবে।”
ছেলেটা ধীরে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
“যেদিন আমি তোমার দিকে তাকানো বন্ধ করব, সেদিন বুঝবে আমি বেঁচে নেই।”
মেয়েটা আবার চুপ হয়ে যায়।
তার চুপ থাকা মানেই সে গভীর ভাবে শুনছে, বিশ্বাস করছে, আর ভালোবাসছে।
তারা বসে পড়ে একটা পুরনো বেঞ্চে। আকাশজুড়ে তারা, নিচে দুজন মানুষ—নীরব, কিন্তু হৃদয়ের ভেতরে প্রচণ্ড স্পর্শের গল্প।
ছেলেটা বলে—
“তোমার শাড়িটার রং আজকে আলাদা দেখাচ্ছে।”
“কেন?”
“কারণ আজ তোমার মধ্যে হাজারটা ভালোবাসা মিশে আছে। তোমার অভিমানে, তোমার হাসিতে, তোমার চোখে—সব জায়গায়।”
মেয়েটা তাকে ছাড়া আর কোথাও তাকায় না।
এই মুহূর্তে সে জানে, এটাই প্রেম।
নরম, গভীর, ও স্থায়ী।
রাত প্রায় শেষ। পূর্ব আকাশে ভোরের আভা দেখা যাচ্ছে। নীল শাড়ির রং ধীরে ধীরে আলোর মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।
ছেলেটা আর মেয়েটা নদীর ধারে এসে দাঁড়ায়।
হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে।
মেয়েটা বলল—
“একটা কথা বলো… আজকের রাতটা কেমন মনে থাকবে তোমার?”
ছেলেটা একটু ভেবে বলল—
“যে রাত আমাকে বুঝিয়েছে, তুমি আমার কাছে শুধু প্রিয় নও, তুমি প্রয়োজন। তুমি অভিমান করো, আমি ঠিক থাকি না। তুমি ঘুরে দাঁড়াও, আমার পৃথিবী বদলে যায়।”
মেয়েটা হেসে ফেলে।
“তাহলে?”
ছেলেটা তার হাত ধরে।
“তাহলে এটা মনে রাখো… এই নীল শাড়ি, এই অভিমান, আজকের এই নীরব রাত—সবকিছু আমি মনে রাখব। কারণ আজ তুমি আমাকে প্রেমের সব রং দেখিয়েছো।”
মেয়েটার চোখ ভিজে ওঠে।
সে খুব ধীরে ছেলেটার কাঁধে মাথা রাখে।
“আমি থাকব,” সে ফিসফিস করে বলে।
“যতদিন তুমি আমার হাত ধরে রাখবে।”
ছেলেটা হাত শক্ত করে ধরে।
“তাহলে আমরা একসাথে চলি… অভিমান ভেঙে, ভালোবাসায় ভেসে।”
সূর্যের প্রথম আলো নীল শাড়ির ওপর পড়ে।
দুজনের ছায়া লম্বা হয়ে যায়।
আর সেই ছায়ার ভেতর জন্ম নেয় শেষ অধ্যায়ের সবচেয়ে নরম বাক্য—
এই প্রেমের উপাখ্যান শেষ নয়,
শুধু একটি নতুন শুরু পেলো।


🖋️মোহাম্মদ মামুনুল ইসলাম চৌধুরী 

📍রিয়াদ,সৌদি আরব



Comments

Popular posts from this blog

Classic Love Story With Red Saree

মায়ের কোল থেকে প্রবাস—ভালোবাসার দূরত্ব নয়

চোখের কোণায় জমে থাকা আমার নীরব স্বপ্নগুলো